Friday, June 7, 2013

নিয়ন আলোর শহরে

  


আমার দিকে তাকিয়ে তুমি হাসতে,
আর কী আজব দ্যাখো-
আমাদের বাড়ির ওঠোনটা ভোরে যেমন আলোকিত হয়ে ওঠত,
তেমন আলোয় ভরে ওঠত তোমার সারাটা মুখ;
যেন, রূপকথার চাঁদের বুড়ির জাদু কাঠি ছুঁয়ে দিয়ে যেতো তোমার ঠোঁটে চোখে গালে,-
আমার পৃথিবীতে ভোরের পাখিরা তখন দুষ্টুমি আর খুনসুটিতে মেতে ওঠত!
জানো বাবা, এখনো আমার পৃথিবীতে ভোর নামে, পাখি গায়;
বর্ষার স্যাতস্যাতে অথবা শীতের বিষন্ন ভোর। এমন ভোরে পাখিরা গায় শুধু নিদ্রার গান।

তোমার কড়ে আঙুলে আর অনামিকা লটকে থাকত প্রতিটা সন্ধ্যায়,
আমি হাঁটতাম আমাদের বাড়ির সামনের ঘাসে ছাওয়া রাস্তা দিয়ে,
তুমি রাজকন্যাদের গল্প বলে যেতে...
আচ্ছা বাবা, তোমার রাজকন্যারা কি আজো ডাইনীর মায়াবল কাটিয়ে ওঠতে পারিনি? মরে আছে ঘুমন্তপরীতে? রাজপুত্তুররা বুঝি পঙ্খীরাজ উড়িয়ে জিয়নকাঠি ছোঁয়ায় নি তাদের শিয়রে?
অথচ দ্যাখো, তোমার রাজকন্যা, ইতিমণি, বন্দী আজ জীবনের কারাগারে!
তুমি তো জানো, তোমার আঙুলই জিয়ন কাঠি আমার জন্য-
তাদের মায়াবি ছোঁয়ায় আমি বারবার কতবার জেগে ওঠেছি!
দুঃস্বপ্নে তোমার কড়ে আঙুল কত হাতড়াই আরেকবার জেগে ওঠব বলে,
ঘাটের শলাকা, জানালার শিক ছাড়া কিছুই ঠেকে না হাতে!

আমার পৃথিবীটা ছিলো ওয়ার্ল্ড ডিজনীর বাম্বি, পিনোকী, স্নো হোয়াইটদের নিয়ে গড়া রঙিন রূপকথার মতো,
আর আজ, পাশের বাড়ির মুদির দোকানীর পৃথিবীর মত সাদা কালো...
কেননা, বাবা তুমি, আমার শৈশবের রূপকথার জাদুকর,
নিজেই আস্ত এক রূপকথা হয়ে গেছো।
তুমি কী আর সত্যি মানুষ হয়ে জেগে ওঠবে না, বাবা?
আমি এই নিষ্ঠুর নিয়ন আলোর শহরে একাকি ঘুমিয়ে যে আছি!

আমাদের বাড়ির ওপরে আমার নিজস্ব যে আকাশটা আমাকে দিয়েছিলে একদিন,
কতদিন দেখি নি সে আকাশ!
এখন এই ভিনদেশী আকাশ হাইরাইজ বিল্ডিংয়ের আড়ালে মুখ ভেংচায়;
আমার আকাশের তারার আলোর নিচে বসে তুমি কতদিন রূপকথা শোনাও না!
এখন সারা শহর নিয়ন আলোয় ভরে থাকে,
এত ঝলোমলো শহরে
বেঁচে আছি আমার আকাশের স্মৃতি নিয়ে,
তোমার স্মৃতি নিয়ে।
হয়তো, একদিন এই নিয়ন আলো
চোখে ঠুলি পরিয়ে ভুলিয়ে দেবে আমার রামধনুর আকাশের স্মৃতি!
সেইদিন কর্পোরেট নিরবতা পালন করব কয়েক মিনিট,
এবং, ক্ষমা করো বাবা,
তোমার স্মৃতির ভার আর সইতে পারছি না।
 
-অপরিচিত মানবী
০৬/০৫/১৩

অবেলা বিকেলে


নিষ্প্রাণ উড়ে তীর বেঁধা এক পাখি,
ক্ষয়িষ্ণু তার মন অবেলা বিকেলে
সুখ খুঁজে ফেরে অচলায়তন মনে;
আমি শুধু তারে ছলছল চোখে দেখি।
 

-অপরিচিত মানবী
০৬/০৫/১৩

বাবা চলে এসো তুমি

প্রথম যখন নিউইয়র্কে আসি আকাশে তারা না দেখলে বাবাকে খুব প্রশ্ন করে জ্বালাতাম বাবা বিদেশে তারা নাই কেন? বাবা কিছু বলতেন না। শুধু বলতেন আছে একদিন দেখবি। আমিও বাবাকে আরো বেশী করে ধরে বলতাম বাবা তারা দেখাও তারা দেখবো। বাবা তখনও একই উত্তর দিয়ে বলতেন দেখবি আমি মরে গেলে একদিন। আমি নিজেই তারা হয়ে যাবো। আমি আর মিতি তখন হাসতাম বাবা কি বলে না বলে।

নিউইয়র্কের আকাশ ভরতি তারা আজকে। কাজ থেকে ফেরবার পথেই চোখে পড়লো আকাশ ভরতি তারা আজ। কি সুন্দর আকাশ। আকাশ জুড়ে হাজার তারার মেলা। মেলাতে নানান রকমের তারা পাওয়া যাবে আজ। আচ্ছা বাবা তুমি কোন তারাটা? আমি তারার মেলায় গিয়ে তোমাকে কিনে আনবো মেলা থেকে। বাবা আকাশ তারার মেলায় ফ্রেম বন্ধী হয়ে থেকোনা আমার ঘরে চলে এসো। কোন দূর নক্ষত্র কিম্বা তারও দূরে সীমাহীন, অনন্ত মহাকাশ জুড়ে আমি তোমায় খুঁজি নিঃশব্দের মাঝে অমানিশার অন্ধকারে, সকাল-দুপুর-সাঁঝে। আমার অস্তিত্বে, হৃদয়ে, আর্তনাদে
আমার অহংকারে, গর্বে সবখানে শুধু তুমি বাবা। বাবা চলে এসো তুমি; আমি মিতি আর তোমার ছেলেরা আমরা সবাই তোমার পথ চেয়ে বসে আছি। আজীবন অপেক্ষায় থাকবো।
 

-অপরিচিত মানবী
০৬/০৬/১৩

সুখগুলো

আজকাল সুখগুলো আমার অসুখে রূপ নিচ্ছে| সুখের সব দূর আকাশের কষ্টের বেশে
কান্না হয়ে ঝরে পড়ছে||
 

-অপরিচিত মানবী
০৬/০৬/১৩

সেই পূর্ণিমা রাতে

বার বার ফিরে আসি ফের কোন এক আশ্বাসে
যদি একমুঠো ভালোবাসা পাই জ্যোৎস্না ভরা রাতে
আমি ঝরে ঝরে যাবো আলোর প্রপাতে
যদি বেড়ে যায় লোভ আরো তাতে,
খুলে ফেলে দিবো সব দুঃখ পোষাক
হারিয়ে যাওয়া তিতির পাখীর তুলে রেখে ডানা
আমি পূর্ণ জোছনার আলো হবো সেই পূর্ণিমা রাতে।।
 

-অপরিচিত মানবী
০৬/০৭/১৩

স্বপ্ন পাখি

বন্ধ  জানালাটা দিয়ে আসছে ঝাপসা আলো। অভিভুত প্রত্যাশায় একটা পাখী বিরামহীন উড়ে চলে। আমার তীব্র অভিমান থেকে ব্যাহত হয় তোমার কাব্য আঙ্গুল। নিরুপায় তুমি শুনিয়ে যাও তোমার অপ্রকাশিত কথা। আমার ছায়া বৃত্তের বাহির করে তুমি খোঁজ জল ঘূর্ণির স্বস্তি। তুমি বার বার প্রশ্নের বিকরনে বিকশিত করো কিছু ছায়া অক্ষরদের। আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখি সোনালি সকাল আর ছায়ায় লুকিয়ে থাকা নীল পরীর গান।

স্বপ্নে স্বপ্নে আকাশে আকাশে আমি স্বপ্ন পাখীর মুখ দেখিনা। ধুলি পথের মাঝে পড়ে থাকে শত সহস্র মানচিত্র ভেদ করা কিছু জলছাপ। ঠোঁটের কাছে কিছু উপচে পড়া নিঃশব্দ বেদনা। আমি তাকিয়ে রই আবার ঘরে ফেরা সংশয়ী কুহকের। দু'চোখ আটকে রয় ইমারত প্রাচীরে। কোথাও কোন দরদী চোখ ফিরে দেখেনা। অভিযোগ করেনা, কথাও বলে না। আমি লিখি বিহ্বল সারি সারি কালো গোটা বর্ণমালা। অবলীলায় লিখে ফেলি আন্তঃনগর দুরন্ত ট্রেনের মতো বিন্যস্ত কাব্য। একটি পঞ্জিকায় যদি আবার দেখা দেয় কোন প্রিয় শতাব্দীর।

পাখী তোমার অজস্র উড়া শেষে একটু ফিরে দেখো একটি অপরাজিতা কি করেব্যথায় নীল হয়ে যায়।

-অপরিচিত মানবী
০৬/০৭/১৩